একজন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন ভূইয়া

নামঃ নুরুল আমিন ভূঞা।
পিতার নামঃ মৃত মহববত আলী ভূঞা।
মাতার নামঃ মানজা/মনিজা খাতুন।
জন্ম তারিখঃ ০১ -০১ -১৯৫৩।
গ্রামঃ নাওয়ান।
ডাকঘরঃ ভাওয়াল ব্রাহ্মণ গাও।
ইউনিয়নঃ বক্ততারপুর।
উপজেলাঃ কালীগন্জ।
জেলাঃ গাজীপুর
সেক্টরঃ ২
প্রশিক্ষণ কালীন কেন্দ্রঃ ভারতের গকুলনগর ও ফটিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প।
যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষকঃ মেজর এ এস এম নাসিম ও অন্যান্য
যুদ্ধকালীন অবস্থানঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল ও আশুগঞ্জ।
সাময়িক সনদ নংঃ ১৭৬৫২০।
ভারতীয় তালিকা নংঃ ৭১২২।
লাল মুক্তিবার্তা নংঃ ০১০৬০৪০৫৩৫।
বাংলাদেশ সেনা গেজেট নংঃ ৫২৬৮।
প্রধান মন্ত্রী সনদ নংঃ ৪২৫৯৬।বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন কতটুকু তা সবাই জানেন এবং বুঝেন। ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান স্বাধীন হয়। পাকিস্তানের প্রথম দিকে যাদের জন্ম তাদের মধ্যে ৭১ সনে যারা মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সেনাবাহিনীতে অংশ গ্রহণ করেছিল তাহাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী। ওদের শতকরা ৯০ ভাগই ছিল ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের পু্র্ব পর্যন্ত আমরা পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত থেকে আরম্ভ করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় নীতিতে বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু বাঙ্গালী জাতির শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, চাকুরীজীবী, বুদ্ধিজীবী এবং জনগনকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যখন অবমূল্যায়ন থেকে রক্ষা করেনি তখন থেকে ওদেরও অবমূল্যায়নের সুচনা হয় যাহার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ শালের ৭ই মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দান শতকোটি জনতার উপস্থিতিতে বিশ্বের এক কালজয়ী ভাষণে বাংলার মুক্তি ও স্বাধীনতা ঘোষনার ডাক দেন এবং যার যাই কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেন আর বলেছিলেন” আমি যদি হুকুম নিবার না পারি তবে বাঙ্গালী এবার বুঝে শুনে কাজ করবে “। আর তাই হল।২৫ সে মার্চ রাতের অন্ধকারে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা শৃঙ্খলিত করে নিয়ে যায় পাকিস্তানে আর শুরু করে দিল বাঙ্গালী নিধন তাই শুরু হয়ে গেল বিশ্বে নিন্দার ঝড়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পেয়ে শুরু হয়ে গেল স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই ৭ই মার্চের দিন ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থকে আমিও শতাধিক ছাত্র সহ সভার সম্মুখস্হলে বেলা ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রেসকোর্স ময়দানে ছিলাম। এই মুহুর্তে গায়ের রক্ত টগবগ করছে সেই দিনের কথা মনে করে। বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ জীবন থাকতে ভুলতে পারবনা। আমি ৭১ এর মে মাসে বিশজন বন্ধু সহ আমার স্রদ্ধেয় বাবার নির্দেশে মৃত জনাব ময়েজউদ্দিন সাহেবের পরিচালনায় আগরতলার হাফানীয়া ট্রেনজিট ক্যাম্পে গমন করি। তথা হইতে বহু যুবক ছেলেসহ আমাদের গকুলনগর অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন। তথায় আমাকে সহ প্রায় তিন হাজার যুবকদের বহু অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেন প্রায় তিন মাস পর্য্যন্ত । সেই খান থেকে মেজর এ এস এম নাছিম, ১১ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার আমাকে সহ ১৭ জন ট্রেনিংপ্রাপ্ত যুবক রিক্রুট করে ফটিকছড়ি নামক আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে আসেন এবং তথায় প্রয়োজন মত আর্মি ট্রেনিং করতে থাকি।মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ :- আজ ১লা ডিসেম্বর। ১৯৭১ সনের এই মাসের ১৬ তারিখে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি দেশ সন্নিবেশিত হয় যে দেশটি স্বাধীন করার জন্য বাঙ্গালী জাতির ৩০ লক্ষ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছিল এবং ২ লক্ষ মা বোন বীরঙ্গনার শোক বহন করেছিল যাহা পৃথিবীর কোন দেশ স্বাধীনতার জন্য এইরুপ ইতিহাস সৃষ্টি করে নাই। আমি ১১ বেঙ্গল রেজিমেন্টের “এ” কোম্পানীর একজন সেনা সিপাহী মুক্তিযোদ্ধা। আজকের এই দিনে আমাদের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার মেজর এ এস এম নাসিম সাহেব আগরতলার ফটিকছড়ি ক্যাম্পে এক জ্বালাময়ী বক্তব্যে বলেন দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রান গেলেও পিছনে হটবনা। আমারা সবাই প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হই।এই সব স্মৃতি মনে হলে এখন খুব কষ্ট হয় কারন স্বাধীনতার জন্য আমরা জীবনবাজী রেখে যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম তাহা কিছু স্বাধীনতাবিরোধী লোক ধূলিসাৎ করে দিতে চায়। কিন্তু আমারা স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি জীবনের বিনিময়ে হলেও এই ষড়যন্ত্র রুখে দিব ইনশাল্লাহ।
৩রে ডিসেম্বর /৭১এ আমরা ফূল বেটালিয়ান পদব্রজে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য রওয়ানা হই। ৬ই ডিসেম্বরে ব্রাহ্মনবাড়িয়া পর্যন্ত পৌছি। ৬ই ডিসেম্বর সন্ধ্যার সময় আমরাও কুমিল্লার চাগদা হয়ে ব্রাহ্মনবাড়িয়া শহরে পৌছি। তথায় অবস্থানকালে তথাকার এক সম্মানিত ব্যাক্তি জনৈক মোঃ মোছলেম উদ্দিন চেয়ারম্যান পরে এম পি বলে পরিচিত লোক আনন্দে আমাদের সবাইকে গরু জবাই করে খাওয়া লেন যাহা আমি জীবিত কালে ভুলতে পারবনা। রাত্রে আমরা তথায় অবস্থান করি। আমরা এই তিন দিনে যতটুকু হেটে এসেছি ততটুকুই মুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরের দিন পুনরায় ব্রাহ্মনবাড়িয়া হইতে পশ্চিম দিকে রওয়ানা হই। যতটুকু হাটি তাহা মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। আমরা হাটতে থাকি। ৭,৮ ও ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে সরাইল শাহাবাজপুরের চান্দরা নামক ব্রীজে পাকিস্তানি সৈন্যদলের সঙ্গে প্রচন্ড সম্মুখ যুদ্ধে ৩৪ জন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লোক হতাহত হয় এবং আমাদের সি ও নাসিম সাহেব পায়ে গুলি লেগে আহত হন। পরে মেজর জনাব এম এ মতিন সাহেবকে সি ও এর দায়িত্বে নিয়োজিত করিলে আমরা তাহার নেতৃত্বে আশুগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে তথায় অবস্থান।অদ্য ১০ই ডিসেম্বর। ব্রাহ্মনবাড়িয়া সরাইল ও আশুগঞ্জ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের পর তাহারা সম্মিলিতভাবে ভৈরবের বিশ্ব গোডাউনে জীবিত হাজার খানেক সৈন্য অবস্থান নেয়। আমারা মেঘনা নদীর পুর্ব প্বার্শে ভেঙ্গকার করে তথায় নির্দেশ মোতাবেক আবস্থান করতে থাকি। তথায় মেঘনার নদীপথ প্রহরার জন্য আমাকে ও কয়েকজনকে জি এফ (গ্রেনেড ফায়ার) রাইফেল দেওয়া হয় পাকিস্তানি গান বোট প্রতিহত করার জন্য। অদ্য রাত্র হতে পুরো কোম্পানি তথায় আবস্থানের নির্দেশ পাই ও তথায় পাহাড়ারত থাকি।১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১। ১১ই ডিসেম্বর থেকে দিবারাত্রি নির্দিষ্ট ভেঙ্কারে পাহাড়ারত থেকে দায়িত্ব পালন করতে থাকি। কোথায় খাওয়া দাওয়া কোথায় বিশ্রাম কোথায় ঘুম এই সবের দিকে কোন খেয়ালই নাই। শুধু একই চিন্তা স্বাধীনতার চিন্তা। মনে দুঃখ কষ্টের কোনরূপ চিন্তা আসেনা। আকাশ পথে ভারতীয় ফাইটার বিমানের মুহুর্মুহু হামলায় আশুগঞ্জ ভৈরব এলাকা প্রকম্পিত। মুক্তি বাহিনী ও মিত্রবাহিনীর পদাতিক আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পর্যুদস্ত। ভৈরবের বিশ্ব ঘোডাউনে আশ্রিত পাকিস্তানি আমাদের কাছে পর্যুদস্ত। ইহার পরেও আমারা মুক্ত এলাকা পাহাড়ায় থাকি।
. আজ ১৪ই ডিসেম্বর। পৃথিবীর ইতিহাসে সব চেয়ে কলঙ্কময় দিন। এই দিনে এবং রাত্রে পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরোচিত রাজাকারদের পুর্ন সহযোগিতায় স্বাধীনতার প্রাক্কালে পাকিস্তানিরা এই বাংলার সবচেয়ে জ্ঞানীগুনী বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে বিভিন্নস্থানে কাপুরোষোচিত ভাবে হত্যা করে। এই নির্মমতা সয্য করার মত মন মানসিকতা মৃতের সন্তান সন্ততীদের এবং আত্মীয় স্বজনদের ক্ষমতা আছে কিনা তাহা আমার জানা নাই। শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্বরন করি নিহতদের। তাহাদের ছেলেমেয়েদের শোক সয্য করার তৌফিক দান করুণ। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সহীহদের আত্মার শান্তি কামনা করি।
আজকের এই দিনে আমি আমাদের সহযোগীদের সঙ্গে পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভেঙ্কারে অবস্থান করে তথায় প্রহড়ায় থাকি। মাঝে মধ্যে ভেঙ্কার থেকে বের হয়ে মুক্ত আকাশ দেখি আর ভাবি কবে দেশ মুক্ত হবে আর কবে বাড়িতে যাব। কবে প্রিয় লোকদের সঙ্গে মিলিত হব? আবার চলে যাই সেই ভেঙ্কারে চলতে থাকে প্রহরা। ভারতীয় ফাইটারের প্রচন্ড গুলিবর্ষনে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত। জয়ের জয়গানে এলাকায় আনন্দের আবাস। আমরা খুব উৎফুল্ল। চলতে থাকে প্রহড়া।
আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পুর্ন হল। কেমন আছি আমরা? ভাল মন্দ মিলিয়েই মানুষ তাহার জীবন পরিচালনা করে। আজ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পরেও এ দেশে স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ শক্তির মধ্যে লড়াই চলছে যাহা আমাদের জন্য বড়ই লজ্জা জনক। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রে এই ধরনের প্রকাশ্যে রাষ্ট্র বিরোধী শক্তি নাই। অথচ আমরা মহা আনন্দে একই সাথে বসবাস করা তাই আমরা মহৎপ্রাণ।
আজ ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকাল ৫-৩০মি! আশুগঞ্জের নদীর পুর্ব প্বার্শে ভেঙ্কারে পু্র্ব পরিকল্পিত প্রহড়ায় থাকি। হঠাৎ বিকট শব্দে ভয় পেয়ে গেলাম। আশেপাশে চতুর্দিক থেকে একসাথে বিকট আওয়াজ পেতে থাকি। হঠাৎ মনে হল চতুর্দিক থেকে আমাদেরকে শত্রুরা আক্রমণ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে থাকা এল এম জি কাক করে ফেললাম এবং মনে মন সংকল্প করে ফেললাম যে জীবনের বিনিময়ে হলেও শত্রুদের খতম করে দেশকে স্বাধীন করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। কিন্তু একটু পরেই ভেঙ্কারের ফাক দিয়ে চেয়ে দেখি আকাশে লাল নীল আলোতে আকাশ ছেয়ে গেছে। কিসের আভাস তাহা বুঝতে খুব কষ্ট হল। সাহস করে বাহিরে বের হলাম। বুঝতে পারলাম দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। চতুর্দিকে গগন বিদারী জয়গান জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে মুখরিত এলাকা। আমাদের ১১ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সমস্ত সেনাগন আনন্দে আপ্লুত। কারো মুখে আনন্দের হাসির রোল চোখে আনন্দ বিষাদের অশ্রু ধারা যাহা এই মুুহুর্তে বর্ননা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। বাড়িতে যাব জীবিত প্রিয়জনদের সাথে এতদিন পরে দেখা হবে এইসব ভাবতে ভাবতে কোন এক সময় যেন মুর্ছা যাই! হঠাৎ দেখি বন্ধদের কোলে আমার মাথা ভিজা। বন্ধুদের কোল থেকে উঠে দেখি সবাই ক্রন্দনরত। সবাইকে দেখে আমিও হাউমাউ করে কেদে ফেললাম।কিছুক্ষণ পরে সবাই আমারা আনন্দে উৎফুল্ল। দেশের বাড়িতে আসার প্রস্তুতি নিতে থাকি। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই সেই সব সহযোগী আর্মি অফিসারদের যাহারা আমাকে অফুরন্ত সাহস দিয়েছেন বিপদে আপদে। জনাব সুবেদ আলী ভূঞা তৎকালীন মেজর,শামসুল হুদা বাচ্চু তৎকালীন লেফ্টেনেন্ট, আবুল হোসন তৎকালিন লেফ্টেনেন্ট, আব্দুল করিম সুবেদার এবং আরও অনেককে যাহারা ছিলেন আমাদের বিপদে মদদ দাতা। সঙ্গীয় বন্ধু হাবিব, আলমগীর, হামিদ তথা নাম ভুলে যাওয়া আরও বহু সেনাবাহিনীর সদস্য যাহাদের জীবিত অবস্থায় ভুলা সম্ভব নয়। এই মুহুর্তে ভুলা সম্ভব নয় বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সেই বাঙ্গালী যিনি আজ আমাদের মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান! স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহল সেইসব ষড়যন্ত্রকারীরা আজ সমগ্র বিশ্বে নিন্দিত। লেখায় ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থী।//বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন ভূইয়ার ফেসবুক এর ৭ই মার্চের (2019) ষ্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হয়েছে উপরে।https://www.facebook.com/nurul.aminbhuiyan